স্বাধীনতা
তুমি আমার ... ?
রাহুল
গুহ
১
স্বাধীনতার
বয়েস হয়েছে – ঊনষাট বছর
বয়েস। তিনি বৃদ্ধ
হয়েছেন – চামড়ায়
ভাঁজ পড়েছে -
বছর ঘুরলে তিনি
আসেন – বৈঠকখানায়
কিছুক্ষন
বসেন – কিছু
খোশগল্প হয় - তারপর
কখন যে চলে
যান টেরও
পাওয়া যায় না ...
শুধু পরের
দিন হাজারো ব্যাস্ততার
মধ্যে মনে হয়
তিনি
এসেছিলেন ... বসেছিলেন
ওইখানে – তারপর ...
স্বাধীনতার
বয়েস হয়েছে – ঊনষাট বছর
বয়েসের বৃদ্ধ।
কৈশোরের
আহ্লাদ, যৌবনের
উচ্ছাসের
পরিবর্তে এখন তিনি
বাৎসরিক
অভ্যেস ... শরীরে
জল – শীর্ণ হাতে
লাঠি –
অথচ চোখদুটি যেন
ঠিকরে বেরোন
উল্কা –
দৃষ্টি পুড়ে
যায় –
স্বাধীনতা
তুমি আমার বৃদ্ধা
ঠাকুমা হবে?
তোমার কাছে চারনকবি
মুকুন্দদাসের
গল্প শুনবো ... ?
২
ইষ্কুল থেকে কলেজ
– সাদা কালো
জীবনের চুনরিতে
লাল নীল ছোপ ... নিশির
ডাকে রাতবিরেতে
বাড়ির বাইরে – অন্য এক
চারন কাব্য তন্ত্রীতে
তন্ত্রীতে -
“প্রিয়, ফুল
খেলবার দিন নয়
অদ্য
ধ্বংশের মুখোমুখি
আমরা
চোখে আর স্বপ্নের
নেই নীল মদ্য
কাঠফাটা রোদে
সেঁকে চামড়া”
উল্টোপাল্টা
সেই সময়ে এক ১৫ই
আগস্টের মিছিলে
বেনিয়াপুকুর বস্তির
মধ্যে স্লোগান
উঠেছিল - “ইনকিলাব
জিন্দাবাদ - ইয়ে
স্বরাজী ঝুটা হ্যায়” ...
অথচ মিছিলের পরে
কাস্তে
হাতুড়ির পাশে
তেরঙ্গা
তোলবার সময় প্রবীণ
কমিউনিস্ট
নেতার চোখে কি
যেন পড়েছিল – আড়ালে গিয়ে
সেটা মুছে
এসেছিলেন ... তারপর
সারাটা দুপুর ধরে
তাঁর
ছোটবেলার
গল্প, অনুশীলন
সমিতির সঙ্গে
জড়িয়ে পড়ার, জেলের
মধ্যে বসে
বন্দেমাতরম
গাইবার গল্প – এইসব বলতে
বলতে তাঁর
চোখদুটি উজ্জল
হয়ে উঠছিল – আজ মনে হয় তিনি
অস্ফুটে বলতে
চাইছিলেন – “ইয়ে
স্বরাজী ঝুটা নেহী
... ”
স্বাধীনতা – তুমি আমার
ফেলে আসা কমরেড
হবে? ... যার সাথে আবার
গাইতে পারবো –
“ দ্যা ট্রুথ
উইল মেক আস ফ্রি
দ্যা
ট্রুথ উইল মেক
আস ফ্রি
দ্যা
ট্রুথ উইল মেক
আস ফ্রি
সাম
ডে ...”
৩
“মাঝি তোর
নাম জানি না
ও আমি ডাক দিমু
কারে ...
মন তোরে কে বা পার
করে ...”
অনেকদিন আগে বটানিক্যাল
গার্ডেন থেকে দেখা
গঙ্গা পারের কলকাতা।
অল্প বৃষ্টিতে
আকাশ আনমণা ... অলশ
একটা স্টিমার ভেসে
চলেছে – ইতি
উতি দুয়েকটা নৌকো
– একটাতে আবার
তেরঙ্গা– হাসি পেয়েছিল
– লোকটার সঙ্গে
মজা করার জন্য
আমরা তিন সদ্যযুবক
ওর নৌকোয় উঠেছিলাম
... “কি গো কত্তা
– পতাকা লাগাইছো
কেন? হাত পার্টির
লোক নাকি গো?” সে ঝাঁঝিয়ে
উঠেছিল ... “পার্টির
হতে যাবে কেন? নিজের
ইচ্ছেয় নিজের পয়সায়
লাগাইছি - ”
মাঝগঙ্গায়
গিয়ে আস্তে আস্তে
বলেছিল – “বাপ-ঠাকুদ্দা
যুদ্ধ করি এই
স্বাধীনতা আনিছে
– এ আমাদের
ভাগ্যি। জানো বাপধন
-
হাওড়ে যখন হাওয়া
দ্যায় আর আমি একা
উজানে নৌকা বেয়ে
যাই – আসে
পাশে কাউরে
দেখা যায় না – আমি তখন এই
ঝান্ডার সঙ্গে
কথা বলি – দেশভাগের
সময় হারিয়ে যাওয়া
দিদি - মরে যাওয়া
বউ ছেলের কথা বলি
” ... বলতে
বলতে বুড়ো চুপ
করে যায় ...
আমার মাথা আজ
সিলিং ফুটো
করে আকাশে
গিয়ে ঠেকেছে - সেই
বুড়ো মাঝি
নাদের আলির
হাত ধরে আমি তিন
প্রহরের
বিলের খোঁজে
হেঁটেই চলেছি উনষাট
বছর...
স্বাধীনতা – তুমি আমার
বন্ধুনি হবে ? কিম্বা
মরে যাওয়া দিদি
? তোমার সঙ্গে আমি
সারাটা রাত্রিজুড়ে
শুধু কথা বলবো
...
৫
এখন মধ্যবয়েস
আমাদের শরীরে – সবুজ নোট
আর দৈনন্দিন কুটকচালীতে
ঘোলাটে
দৃষ্টি – ঝা চকচকে বিশ্বায়নের
লাল কার্পেটে জমে
উঠেছে জমকালো জম্পেস
প্যাঁচাল - তরল
হাসিতে চলকে পড়ছে
অষ্টাদশী বলিউড
ভারতবর্ষ – আন্তর্জালে
গ্লোবাল কুমিরডাঙ্গা
আর ঝিন চ্যাক ছু
কিৎ কিৎ খেলা চলছে
অষ্টপ্রহর ...
আর অন্য গোলার্ধে
বসে মজা দেখছি
আমরা হাড় হাভাতে
বিশ্বরাষ্ট্রের
নাগরিকবৃন্দ
...
এখনো স্বাধীনতা
দিবস একটি ঘনিষ্ট
সুন্দর ছুটির দিন
– পাড়ায়
পাড়ায় সকালবেলা
পতাকা উত্তোলন
– কাঙালীভোজন
– পাকিস্তান,
ভ্রষ্টাচার, বিচ্ছিন্নতাবাদ
আর গরিবী
হঠানোর
স্বপ্ন এঁকে লাল
কেল্লায় প্রধানমন্ত্রীর
ভাষন আর সেটা শোনার
জন্য বাবা টিভির
সামনে জোর করে
বসান সবাইকে - রেডিওতে
দেশাত্ববোধক গান
হয় আর খাকি ড্রেস
পরা ঝকঝকে চেহারাগুলো
দেখে
অজান্তেই বুক
গর্বে ফুলে
ওঠে ... লোভ লাগে
...
আর পরবাসে
বসে দেশাত্মবোধের
এই নরম
রোদ্দুর পোয়াতে
পোয়াতে আজকাল এক
ধরনের অপরাধ বোধ
হয় ...
জনান্তিকে কে
যেন বার বার
বলতে থাকে... “রাত
কত হইলো – উত্তর
মেলে না - বিট্রেয়ার
... ইউ আর আ
বিট্রেয়ার ...”
মুখ চেপে ধরি
... গলার শিরা
টিপে ধরি ... কিন্তু
থামাতে পারি
না ...
আজ এই বিশ্বায়নের
দিনে – এই
সস্ত্যায়নের
দিনে ...
স্বাধীনতা – তুমি আমার
শাস্তি হবে ? যাবজ্জিবন
স্বদেশবাস আর একফুটবল
মাঠ স্বপ্ন দেখার
শাস্তি ?
১৫ই আগস্ট, ২০০৬