যুগসন্ধিক্ষনে পশ্চিমবঙ্গ

চিত্রগ্রীব চট্টোপাধ্যায়

যারে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা বর্ষব্যাপি বাঁকা চলনে চলতে চলতে, কেন্দ্রের বঞ্চনার বিরুদ্ধে অরণ্যরোদন এবং কুম্ভিরাশ্রু বর্ষন করে, চালু কারখানায় বিপ্লবী তালা লাগিয়ে, বন্‌ধের ধামাকা বাজিয়ে, অ্যামেরিকান সেন্টারের সামনে লাল পতাকা নিয়ে শান্তি মিছিল করে, আমার নাম তোমার নাম ভিয়েতনাম ভিয়েতনাম মালাজপ করে বিপ্লবী আফিমে বুঁদ  হয়ে, প্রাথমিক   স্তরে ইংরাজী তুলে দিয়ে এবং আবার ফিরিয়ে এনে  আজকের পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান এক আর্থ-রাজনৈতীক ভুলভুলাইয়ায় বেরোবার পথ জানা নেই - সোনার ডিম পাড়া হংশটি মৃতপ্রায় ... চিকিৎসক হাস্যকর রকমের নির্বোধ বাঁচিয়ে তোলার জীবনদায়ী ঔষধ নিতান্ত দূর্লভ ...

এই সময় বৃদ্ধ ভদ্রলোক অবসর নিলেন ...

পরিবর্তে এলেন আপাত তারুণ্যের প্রতীক অন্যএকজন ... আপাদমস্তক বঙ্গসন্তান ভদ্রলোক পুরানো স্লোগান ভূলে ডাক দিলেন ডু ইট নাও ... জনগনেশ আশ্চর্য হলেন ... বিপক্ষ কটাক্ষ করলেন ... কিছু সংবাদপত্র উল্লসিত হলেন  ... কিছু সংবাদপত্র ধন্ধ্বে পড়ে বৈজ্ঞানিক রিগিঙের তত্ত্ব সাজাতে বসলেন ... মুশকিলে পড়লেন সরকারি কর্মচারীরা ...

ভদ্রলোক কিন্তু থামলেন না ... আরো এককাঠি এগিয়ে বললেন বন্‌ধ হানিকর, কর্ম সংস্কৃতি ফেরাতে হবে ... ঘন ঘন বৈঠক করলেন শিল্পমহলের সঙ্গে, কেন্দ্রের সঙ্গে, মন্ত্রীদিগের সঙ্গে ... বহু কষ্টে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে কিছু শিল্পপতিকে ফিরিয়ে আনলেন বুকে বল এলো সাধারন মানুষের, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্রছাত্রীদের - অস্বস্ত্বিতে পড়লেন কমিউনিজ্‌মের কর্মবিমূখ বঙ্গীয় ভার্সানের ধ্বজাধারী কমরেডরা ... এবং ঘোলা জলে মাছ ধরতে নেমে পড়লেন লুপ্তপ্রায় আরেক প্রজাতি যার নাম বিরোধী পক্ষ!

এই যাত্রাপথে পশ্চিমবঙ্গ আজ এক যুগসন্ধীক্ষণে উপস্থিত ... টাটা মোটর কোম্পানি পশ্চিমবঙ্গে তৈরী করতে চলেছে তাদের পরবর্তী ড্রিম প্রোজেক্ট ... হুগলির সিঙ্গুরের কাছে এক হাজার একর জমির ওপর গড়ে তুলতে চেয়েছে অটো হাব ... যাতে গাড়ির পাশাপাশি গড়ে উঠবে আরো বহু আনুসঙ্গীক শিল্প ... মূলতঃ যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা।

শিল্পের জন্য জমি লাগে ... তাই জমি নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আছে নাবাল, জলা জমি, এক ফসলি এবং বহু ফসলি জমি। সরকারি হিসেব অনুযায়ী নব্বই শতাংশ জমি একফসলী।

আইন অনুযায়ী সরকার যেকোন সময়ে জমি অধিগ্রহন করতে পারে ... তার জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে তাঁরা বাধ্য নন। এক্ষেত্রে ১৪০ কোটি টাকার ওপর ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে (এক ফসলী জমি সাড়ে আট লক্ষ, দুফসলী জমি সাড়ে বারো লক্ষ)। ৯৯৭ একরের মধ্যে ৯৫২ একর জমি হস্তান্তর কাজ শুরুর প্রথম কয়েক সপ্তাহের মধ্যে হয়ে গিয়েছে ... ক্ষতিপূরণ বন্টন প্রায় সম্পুর্ণ (১২,০০০ এর মধ্যে ৯০৫০ জন ক্ষতিপূরণ নিয়ে নিয়েছেন)... ক্ষতিপূরণের পরিমান বাজার দরের দেড়গুন, বহুফসলী জমির জন্য ভবিষ্যতের ফসলের হিসাবে ক্ষতিপূরণের পরিমান ধার্য হয়েছে। এমনকি ২৭৫ ভূমিহীন চাষীদের এই ক্ষতিপূরণের আওতায় আনা হয়েছে। আরো ১৮০ জনকে আনার চেষ্টা চলছে। এই বিপুল বাজারকে ধরার জন্য রাষ্ট্রায়ত্ব এবং প্রাইভেট ব্যাঙ্কগুলি বিশেষ শাখা খুলেছে।

কিন্তু টাকা পেলেও কি হবে কর্মহীন মানুষদের? জমিচ্যুত চাষীদের প্রশিক্ষনের জন্য বিশেষ ব্যাবস্থা করা হয়েছে ... ১৮১৫ পুরুষ এবং ৪০ জন মহিলা এই প্রশিক্ষনে যোগ দিয়েছেন প্রত্যেককে মাসে ৫০০ টাকা করে স্টাইপেন্ড দেওয়া হচ্ছে। স্বনি্বভর প্রকল্পের জন্য বিশেষ লোন দেওয়ার কথাও হচ্ছে। এছাড়া প্রত্যেক পরিবারের একজনকে চাকরি দেবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

এই বিষয়গুলি যথেষ্ট কি না এই নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে ... টাটা গোষ্ঠীর এই প্রকল্পে রাজ্য সরকারের অর্থভান্ডার কতোটা বৃদ্ধি পাবে, জমির লিজ ঠিকদামে হয়েছে কি না সেসব নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে - আলোচনা চলতে পারে ... গনতন্ত্রে সেটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু প্রশ্ন উঠছে শিল্পের জন্য জমি দেওয়া উচিৎ কি না তা নিয়ে। প্রশ্ন উঠছে বাম সরকারের সঙ্গে শিল্পপতিদের এতো দহরম মহরম কেন? প্রশ্ন উঠছে কেন রাজ্য সরকার পুলিশ ব্যাবহার করে জমি অধিগ্রহন করছে? প্রশ্ন উঠছে সিঙ্গুরে আলু না হলে কলকাতায় আলুর দাম বেড়ে যাবে কি না।

এবং এই প্রশ্ন তুলে বিরোধী নেত্রী জঙ্গী থেকে অতিজঙ্গী আন্দোলন শুরু করেছেন সঙ্গী হয়েছেন সুপ্ত, ক্ষুব্ধ এবং বিক্ষুব্ধ সি পি আই এম (এল, এল এফ, এল এ, এল বি) নকশালপন্থীরা, ভারতীয় জনতা পার্টি এবং ধরি মাছ না ছুঁই পানি করে কংগ্রেস।

একদিকে নব অর্থনীতি ভালো খারাপ যাই হোক ভারতবর্ষ তথা প্রায় সারা বিশ্ব (মায় রাশিয়া এবং চীন) এখন সেই রাস্তায় ... না চাইলেও বাজার অর্থনীতি এবং মেড ইন চায়না আমাদের শোবার ঘরের নিত্য বাসিন্দা... টেলিভিশন এবং ইন্টারনেটের দৌলতে বিশ্ববাজার আমাদের হাতে ... আমরাও বিশ্ববাজারের হাতে। প্রথম ম্যাকডোনাল্ড কিম্বা ওয়াল মার্ট দেখে অপুর রেললাইন দেখার আনন্দ পাবার দিন শেষ সেই অর্থনীতিতে যুক্ত হবার সময় আসন্ন। মোদ্দা কথা হল এই যে ভারতবর্ষের অর্থনীতি এক নির্দিষ্ট রাস্তায় চলেছে সেই রাস্তায় খানা খন্দ থাকলেও সেটাই এই মুহূর্তে একমাত্র রাস্তা।

এই জায়গায় দাঁড়িয়ে শ্রোতের উজানে যাবার কোনো উপায় আছে কি? প্রয়োজন ... ?

কিন্তু কি হবে আমাদের কমিউনিজ্‌মের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসের? কমিউনিস্ট রোমান্টিসিজ্‌মের ?

যাঁরা মার্ক্সবাদে বিশ্বাস করেন, তাঁদের কাছে তো এটা আরো স্বাভাবিক মনে হবার কথা। বিপ্লবের কচকচানিতে ভূলে গেলে চলবে না যে কমিউনিজ্‌ম কিন্তু প্রাচুর্যের সাম্যবাদের কথা বলে ... দারিদ্রের কিম্বা অপ্রতুলতায় কিন্তু সাম্যবাদ আসে না আসার কথাও নয়। সামন্ততন্ত্র ধনতন্ত্র সমাজতন্ত্র বা কমিউনিজ্‌ম এই যাত্রায় কিন্তু আসল চালিকা শক্তি হল টেকনোলজি বা প্রযুক্তি। প্রযুক্তির উৎকর্ষ নিত্যব্যাবহার্য দ্রব্যের উৎপাদনশীলতা এমন যায়গায় বাড়িয়ে নিয়ে যায় যে ডিম্যান্ড/সাপ্লাই গ্রাফে মূল্য ক্রমশঃ নিচে নামতে থাকে এবং ফলে লাভের গুড় পিঁপড়েয় খেয়ে যায়। ব্যাবসার চালিকা শক্তি যেহেতু লাভ, তাই সেই ব্যাবসায় ব্যাক্তি উৎসাহ হারিয়ে ফেলে ফলে রাষ্ট্রকে তার দায়িত্ব নিতে হয়। রাষ্ট্রায়ত্ব সংস্থার জন্ম হয় কিন্তু তার ভিত্তি প্রযুক্তি এবং প্রাচুর্য কর্মহীনতা নয়।

ধনতন্ত্রের পূর্ণ বিকাশ সমাজতন্ত্রের পথিকৃত ... এটা মার্ক্সেরই কথা ... সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং চীনের বর্তমান নীতি তার প্রমান ...

আর শিল্পের জন্য জমি লাগে এবং প্রয়োজনে সেটা ফসলী জমি হয়। লস এঞ্জেল্‌স, সিলিকন ভ্যালি মায় চীন ও সেই পথেরই সন্ধান দেয় ...

আজকের ভারতবর্ষ তথা পশ্চিমবঙ্গ কিন্তু দাঁড়িয়ে সামন্ততন্ত্র এবং ধনতন্ত্রের মাঝামাঝি এক জায়গায়। তাই ধনতন্ত্রের অর্থাৎ শিল্পের বিকাশ একমাত্র রাস্তা। তাই ইন্দিরা-নেহেরুপন্থী আধা-সোস্যালিজ্‌মের ধ্বজা না তুলে বর্তমান অর্থনীতি অনেক বেশী বাস্তববাদী এবং বিপ্লবী।

পশ্চিমবঙ্গের মানুষের অশেষ সৌভাগ্য যে অবশেষে আমাদের শাসক দলের নিরেট মস্তিষ্কে এটা ঢুকেছে। তাই তাঁরা এখন তোতাপাখীর মতন শিল্পায়নের গান গাইছেন।

শুরু হয়েছে নতুন এক অর্থনৈতীক বিপ্লব। তেভাগা আন্দোলনের মতোই সিঙ্গুর এই যাত্রার আঁতুড়ঘর এর ফলশ্রুতির ওপর নির্ভর করবে ভবিষ্যতের যাত্রাপথ। একদিকে যেমন সমাপ্ত হবে জমি না শিল্প এই অর্থহীন বিতর্কের অন্যদিকে শিল্পমহল ফিরে আসবে পশ্চিমবঙ্গে শুরু হবে কর্মযজ্ঞের।

আর যদি না হয় সিঙ্গুর থাকবে তার নিজের জায়গায় চাষবাস হবে কিন্তু নতুন প্রযুক্তি আসবে না কেননা সেটা কেনার মত ক্ষমতা সাধারন চাষীদের নেই। অতএব কিছুদিন বাদে সিঙ্গুরে উৎপাদিত আলুর চেয়ে কম দামে পাঞ্জাবের আলু কলকাতায় পাওয়া যাবে এবং রংচঙে মোড়কে তা বিক্রি করবে ওয়াল মার্ট খেয়ে আমাদের রাজনৈতিক নেতারা আরামের ঢেঁকুর তুলবেন। কিন্তু সিঙ্গুরের (৯৯৭-৯৫৪=) ৪৩ একর বহুফসলী আর পাশের একফসলী জমির মধ্যে কোনও ফারাক থাকবে না। আরো বড় কথা হল চাইলেও সেই জমি নিতে এগিয়ে আসবেন না কোনও শিল্পপতি...

আর বাকি পশ্চিমবঙ্গের আমাদের সামনে পড়ে থাকবে আরো দুই দশকের অন্ধকার আর্থ-সামাজিক নীতি

মনে রাখতে হবে রবীন্দ্রনাথ-সত্যজিৎ সংস্কৃতির বারফাট্টাই কিন্তু পেটের ভাত যোগাবে না আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের ...

এবং রাজনীতি তৃণমুল, কংগ্রেস, বিজেপি এবং নকশাল যখন একসাথে মিলিত হয় তখন তাঁদের রাজনৈতিক শূন্যতা বোঝার জন্য কষ্ট করতে হয় না। একদল নির্বাচনে প্রায় মুছে যেতে বসেছেন, আর এক দল হাজার চেষ্টা করেও পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে জমি তৈরী করতে পারছেন না আর অন্যজন জনগনের কাছ থেকে বহুদিন আগেই নিশ্চিহ্ন হয়ে ইউনিভার্সিটির ইউনিয়নে বিপ্লবের গান বাঁধছেন। সিঙ্গুরের পুলিশের প্রতি অ্যাসিড বাল্ব ছোঁড়া এবং তৃণমুল চেয়ারম্যান আমার চেয়ারম্যান মেনে তাঁর সঙ্গে অনসনে বসাটা তাঁদের নতুন লড়াইয়ের সংজ্ঞা। তাছাড়া আছেন কিছু নেতা-নেত্রী যাঁরা ঝোঁপ বুঝে কোপ মারেন এবং সেই সূত্রে দিল্লীতে হাইকম্যান্ডের নেক নজরে এসে গুছিয়ে নেন নিজশ্ব আখের।

পশ্চিমবঙ্গের মানুষ কিন্তু সরল বাস্তব জানেন ... তাঁরা জানেন যে চাকরি না হলে খেতে পাওয়া যায় না আর শিল্প না হলে চাকরি হয় না। এতোদিন শিল্পের আকাল ছিল আর আজ যখন শিল্প আসছে আমরা অন্য ধুয়ো তুলছি।

রাজনীতির জগতে কালিদাসী নীতি চলে জীবনে চলে না ...

আশা করবো এই যুগসন্ধিক্ষণে অন্ততঃ একবার পশ্চিমবঙ্গের মানুষ তাঁদের নিত্যনৈমিত্তিক উন্নাসিকতা ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে খোলা আকাশের নিচে বাস্তবের জমিতে দাঁড়াবেন ...

পুনশ্চঃ প্রথমে ভাবিয়াছিলাম ইহা লইয়া খোরাক করিয়া লিখিব ... মমতার সার্কাস দেখিয়া বড় সাধ হইয়াছিল। কিন্তু মন মানিল না ... নিজের স্বভূমের বাঁচা মরা লইয়া টানাটানি - ইহার মধ্যে মজা ঠিক নহে ...

ক্যালিফোর্নিয়া, ১৩ ডিসেম্বর ২০০৬